Tuesday, November 9, 2021

কুরআন ও হাসিদের আলোকে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নির্মূলের উপায়

   


১। ভূমিকা।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বর্তমান বিশ্বের একটি ভয়াবহ সমস্যা। পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই কান দেশের জনগণ সন্ত্রাস ও জঙ্গীদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্থ নয়। অসাম্প্রদায়িকউদার ও গণতন্ত্রমনা মুসলিম দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশও সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদের কবল থেকে মুক্ত নয়। সকল শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে সম্প্রতি বাংলাদেশে আল্লাহর আইন চালুর দোহাই দিয়ে একটি সন্ত্রাসীজঙ্গী ও অত্যাদা চত্রের উত্থান ঘটে। তারা দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীবিদেশি মেহমানবিজ্ঞ বিচারক সহ নিরীহ জনগণের উপর অভিমত কায়দায় আত্বঘাতী বোমা হামলা চালাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। ইসলাম শান্তিসৌহার্দ ও সহনশীলতার ধর্ম। ইসলাম কোন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সমর্থন করে না। এ প্রসঙ্গে ইসলামের নির্দেশনা হলো-

 

২। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ পরিচিতি।

ক। সন্ত্রাস।

‘সন্ত্রাস’ শব্দটি ত্রাস শব্দ থেকে এসেছে। শব্দটির ইংরেজি হলো Terrorসেখান থেকে Terrorism। ত্রাস অর্থ হলো ভয়শঙ্কাভীতি। আর সন্ত্রাস অর্থ হলো কোন উদ্দেশ্যে মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করার প্রচেষ্টাঅতিশয় শঙ্কা বা ভীতি।

পারিভাষিক অর্থে ‘সন্ত্রাস’ অর্থ যে কোন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অত্যাচারহত্যা প্রভৃতি হিংসাত্বক ও ত্রাসের পথ বেছে নেয়া। সন্ত্রাসের পরিচয়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায়বলা হয়েছে,

Terrorism: The systematic use of violence to create a general climate of fear in a population and thereby to bring about a particular political objective.

 

খ। জঙ্গী বা জঙ্গীবাদ

জঙ্গী শব্দটি ফার্সি। জঙ্গ’ শব্দ থেকে জঙ্গি শব্দটি এসেছে। জঙ্গ অর্থ যুদ্ধ বা সংগ্রাম। আর জঙ্গী শব্দের অর্থ যুদ্ধপ্রিয়। শব্দগুলোর ইংরেজী হলো MilitantMilitancy. ইদানিং শব্দগুলো বিশ্বে পরিচিত ও অতি ব্যবহৃত। আভিধানিক অর্থে শব্দগুলো নিন্দনীয় বা খারাপ অর্থে ব্যবহৃত হতো না। এর অর্থ যোদ্ধাসৈনিক বা যুদ্ধে ব্যবহৃত বস্তু বোঝাতে এ শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো।

 

৩। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে কুরআন ও হাদিসের ভূমিকা।

ক। ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করা হারাম।

আল-কুরআন

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ﴿الأعراف: ٥٦﴾

দুনিয়ার শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা যাবে না।” (সূরা আল-আরাফ: ৫৬)

وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ﴿البقرة: ١٩١﴾

ফেতনা ফাসাদদাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ।” (সূরা বাকারা: ১৯১)।

وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿القصص: ٧٧﴾

তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় (সন্ত্রাস) সষ্টি করতে চেও না। আল্লাহ বিপর্যয় (সন্ত্রাস) সৃষ্টি করাকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল কাসাস: ৭৭)

وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَٰئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ ﴿الرعد: ٢٥﴾

যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য আছে লা'নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস (জাহান্নাম)।” (সূরা আর-রাদ: ২৫)

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ ـ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ ﴿البقرة: 12-١١﴾

যখন তাদেরকে বলা হয় পৃথিবীতে বিপর্যয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করো নাতখন তারা বলেন আমরা সংশোধনকামী মাত্রসাবধান এরাই হচ্ছে প্রকত সন্ত্রাসী কিন্তু এ বিষয়টি তারা উপলদ্ধি করছে না।” (সূরা বাকারা: ১১,১২)

إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿الشورى: ٤٢﴾

অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধেযারা মানুষের উপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়তাদের শাস্তি হলোতাদের হয়তো হত্যা করা হবেনয়তো শূলে চড়ানো হবে অথবা হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে কিংবা তাদের দেশান্তর করা হবে। এটা হলো তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য আছে আরো কঠোর শাস্তি। ’ (সুরা মায়েদাআয়াত: ৩৩)

 

আল-হাদিস

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ

(১) প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)

«لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُرَوِّعَ مُسْلِمًا»

(২) মুসলমান কর্তৃক অপর মুসলমান ভাইকে আতঙ্কিত করা বৈধ নয়।” (আবু দাউদ ৫০০৪)

«مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

(৩) যে ব্যক্তি আমাদের (অথাৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারী-৭০৭০মুসলিম-৯৮)।

«مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ، فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ، حَتَّى يَدَعَهُ وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ»

(৩) আবুল কাসিম (সাঃ) বলেছেনকোন ব্যক্তি যদি অস্ত্র দ্বারা তার ভাইকে হুমকি দেয়তবে তা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত ফেরেস্তাগণ তার প্রতি অভিশাপ করতে থাকেন। যদিও হুমকি প্রদানকৃত ব্যক্তি তার সহোদর ভাই হয়। (মুসলিম-২৬১৬)।

 

খ। মানুষ হত্যা হারাম।

আল-কুরআন

মানুষ হত্যা করাকে আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

(১) "বেধ কারণ ব্যতীত কেউ যদি কাউকে হত্যা করেসে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। আর যদি কেড কাউকে জীবন দান করেতবে সে যেন সমস্ত মানুষকে জীবন দান করল।” (সূরা মায়েদা-৩২)

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ﴿النساء: ٩٣﴾

(২) যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করেতার শাস্তি জাহান্নামতাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেনতাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা নিসা-৯৩)।

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ۗ وَمَن قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِف فِّي الْقَتْلِ ۖ إِنَّهُ كَانَ مَنصُورًا ﴿الإسراء: ٣٣﴾

সে প্রাণকে হত্যা করো নাযাকে আল্লাহ হারাম করেছেনকিন্তু ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি। অতএবসে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন না করে। নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত।

 

অলি-হাদিস

মহানবী (সাঃ) । হাদিসে মানুষ হত্যাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এ প্রসংগে তিনি বলেছেন,

হাদীস শরীফে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে-

لا يحل دم امرئ مسلم إلا بإحدى ثلاث : رجل زنى بعد إحصانه فعليه الرجم، أو قتل عمدا فعليه القَوَد، أو أرتد بعد إسلامه فعليه القتل.

অর্থা তিন কারণের কোনো একটি ব্যতীত কোনো মুসলিমের রক্ত হালাল হয় নাযদি বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করে তবে তাকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হবে অথবা যে ইচ্ছাকৃত কাউকে হত্যা করে তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হবে অথবা যে ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে যায় তাকে হত্যা করতে হবে। -মুসনাদে আহমাদহাদীস ৪৫২ ও ৪৩৭সুনানে নাসায়ী ৭/১০৩আরো দেখুনমুসনাদে আহমাদহাদীস ৩৬২১সহীহ বুখারীহাদীস ৬৮৭৮কিতাবুদ দিয়াতঅধ্যায় ৫সহীহ মুসলিমহাদীস ১৬৭৬কিতাবুল ক্বসামাহঅধ্যায় ৬

 

এটা তো অবশ্য সবাই জানে যেএসব অপরাধের শাস্তি (হদ বা কিসাস) বাস্তবায়ন করা ক্ষমতাসীন দায়িত্বশীলদের কাজ।

 

«لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ

(১) “আল্লাহর কাছে একজন মুসলমান নিহত হওয়ার চেয়ে সারা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়াও অনেক হালকা ব্যাপার। (তিরমিযী-১৩৯৫)

 

(২) “যে ব্যক্তি কোন মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং আত্মতৃপ্তি ভোগ করে যেসে সঠিক পথের উপর আছে। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার কোন ইবাদত ও দান সাদকা কবুল করেন না।” (আবু দাউদ)।

 

(৩) “যদি আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীরা একজন মুমিন ব্যক্তির হত্যাকান্ডে অংশগ্রহন করেতাহলে আল্লাহ পাক তাদেরকে অধোমুখী করে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।” (আল-হাদিস)

 

কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর চুলের মুঠো ও মাথা ধরে আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে তখন তার রগগুলো থেকে রক্ত ঝরতে থাকবে। সে ফরিয়াদ করবেহে আমার প্রভু! এই ব্যক্তিই আমাকে হত্যা করেছে। এ কথা বলতে বলতে সে আরশের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।’ (তিরমিজিনাসাঈ)

 

কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে প্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবেতা হলো রক্তপাত বা হত্যা-সম্পর্কিত।’ (বুখারিমুসলিম)

«لَنْ يَزَالَ المُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ، مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا»

একজন প্রকৃত মুমিন তার দীনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশান্ত থাকেযে পর্যন্ত সে অবৈধ হত্যায় লিপ্ত না হয়।’ (বুখারিঃ 6862)

 

যদি আসমান-জমিনের সব অধিবাসী একজন মুসলমানকে অবৈধভাবে হত্যা করার জন্য একমত পোষণ করেতবে আল্ল­াহ তাদের অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)

 

রাসূলুল্লাহ সা: ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে শান্তিস্থিতিশীলতাসম্প্রীতি ও নিরাপত্তার মর্মবাণী ঘোষণা দিয়ে বিদায় হজের ভাষণে বললেন,

«إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا

তোমাদের রক্ত তথা জীবন ও সম্পদ পরস্পরের জন্য হারামযেমন আজকের এই দিনেএই মাসে ও এই শহরে অন্যের জানমালের ক্ষতিসাধন করা তোমাদের ওপর হারাম।

 

একবার হামজা রা: নবী সা:-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেনহে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন পথ বলে দেন যা আমাকে সুখী করবে। রাসূল সা: বললেনমানুষের জীবন রক্ষা এবং ধ্বংস করাÑ এ দুটির মধ্যে তুমি কোনটি পছন্দ করোহামজা রা: বললেনমানুষের জীবন রক্ষা করা। রাসূল সা: বললেনদুনিয়া ও আখেরাতে সুখী হওয়ার জন্য তুমি এ কাজই করতে থাকো। (মুসনাদে আহমাদ : ৬৪৬০)

«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ المُوبِقَاتِ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ اليَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ المُحْصَنَاتِ المُؤْمِنَاتِ الغَافِلاَتِ»

মানব হত্যা সবচেয়ে বড় পাপ। রাসূল সা: বলেছেনতোমরা সাতটি মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো। এ সাতটি মহাপাপের প্রথমটি হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা। আর তৃতীয়টি হলো অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। (বুখারি : ৬৮৫৬)

 

কিয়ামতের দিন মানুষ হত্যার বিচার করা হবে সবার আগে। তারপর অন্যান্য অপরাধের বিচার করা হবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফয়সালা হবেতা হলো রক্তপাত (হত্যা) সম্পর্কিত।’ (বুখারি : ৬৩৫৭মুসলিম : ৩১৭৮)

 

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে নিয়ে আসবে। হত্যাকারীর চুলের অগ্রভাগ ও মাথা নিহতের হাতের মুষ্টিতে থাকবে আর তার কণ্ঠনালী থেকে তখন রক্ত ঝরতে থাকবে। সে বলবেহে আমার রবএ ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। এমনকি সে তাকে আরশের কাছে নিয়ে যাবে।’ (তিরমিজি : ২৯৫৫মুসনাদ আহমদ : ২৫৫১)

 

রাসূল সা: বলেছেন, ‘কোনো মুমিন বান্দা যদি আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় হাজির হয় যেসে কারো রক্ত ঝরায়নিঅর্থা কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়ায়নিতাহলে আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায় তাকে ক্ষমা করে দেয়া। (মুসলিম : ১৩৯)

«سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»

মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকি এবং তাকে হত্যা করা কুফরি।’ (বুখারি : ৪৮)

 

গ। ইসলামে অমুসলিমকেও হত্যা করা হারাম।

ইসলামে মুসলমানকে হত্যা করা যেমন হারাম ঠিক তেমনি অমুসলিমকেও হত্যা করা হারাম। এ প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আল-কুরআন

(১) “আর তোমরা কোন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো নাযাকে হত্যা করা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন।” (সূরা বনী ঈসরাইল-৩৩)

لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الممتحنة: ٨﴾

দ্বিনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করেনিতাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা: মুমতাহিনাআয়াত: ৮)

 

আল-হাদিস

এ প্রসংগে মহানবী (সাঃ) বর্ণনা করেছেন,

مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا فِي غَيْرِ كُنْهِه حَرَّمَ الله عَلَيْهِ الْجَنَّةَ.

অর্থা যে কোনো মুআহাদকে[1] অন্যায়ভাবে হত্যা করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৩৭৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৬০; সুনানে নাসায়ী ৮/২৪-২৫

 

«مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا تُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا»

(১) “যে ব্যক্তি মুসলমান জনপদে চুক্তিবদ্ধ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও তার সুগন্ধ পাওয়া যাবে।” (বুখারী-৩১৬৬)

 

আলী রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি এ ধরনের অমুসলিমদের ব্যাপারে বলেছেন-

مَنْ كَانَ لَهُ ذِمَّتُنَا فَدَمُهُ كَدَمِنَا، وَدِيَتُهُ كَدِيَتِنَا.

অর্থা যার সঙ্গে আমাদের আহদ বা চুক্তি রয়েছে তার জান আমাদের জানের মত এবং তার দিয়ত (রক্তপণ) আমাদের দিয়তের পরিমাণ। -কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, ৪/৩৫২-৩৫৫; মুসনাদে শাফেয়ী ১৬১৯

 

«أَيُّمَا رَجُلٍ أَمِنَ رَجُلًا عَلَى دَمِهِ ثُمَّ قَتَلَهُ، فَأَنَا مِنَ الْقَاتِلِ بَرِيءٌ، وَإِنْ كَانَ الْمَقْتُولُ كَافِرًا»

(২) "কোন ব্যক্তি যদি নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করেতবে আমার সাথে ঐ হত্যাকারীর সাথে সম্পর্ক থাকবে না। যদিও নিহত ব্যক্তি কাফির হয়।” (সহিহ ইবনে হিববান-৫৯৮২)

 

ঘ। ইসলামে আত্মহত্যা বা সুইসাইড হারাম।

 

(১) আল-কুরআন।

আত্মহত্যা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা নিজেদেরকে নিজেরাই হত্যা করো । কেননা আল্লাহ তো তোমাদের প্রতি অতীব দয়াবান।” (সূরা নিসা-২৯)

(2) আল-হাদিস।

এ প্রসংগে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের পূর্বে চলে যাওয়া লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হলসে আহত হয়ে গেল এবং ছটফট করতে শুরু করে দিল। এ অবস্থায় সে ছুরি হাতে নিজেই নিজের হাত *ঙ্গে ফেললো। এতে তার এতো বেশি রক্ত ঝরল যেতাতে তার মত্য হলো।” আল্লাহ এ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেনআমার এ বান্দা নিজের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। এ কারণে আমি ৩ার।

করে দিয়েছি। (বুখারী মুসলিম)

 

৪। আল-কুরআনে বর্ণিত জিহাদ শব্দের ব্যাখ্যা। জিহাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আল-কুরআন।

(ক) “তোমরা আল্লাহর জন্য জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিৎ।” (সূরা হজ্জ-৭৮) (খ) “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করতার নৈকট্য অন্বেষন কর এবং তার পথে জিহাদ করো।” (সূরা মায়িদা-৩৫)

জিহাদআরবি শব্দ ‘জুহুদুন’ থেকে শব্দটি নির্গত হয়েছেএর অর্থ-সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানােকঠোর পরিশ্রম করাসাধনা করা বুঝানাে হয়েছে। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ণ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করা এবং সে কাজের জন্য কষ্ট করাকে জিহাদ বলা হয়।

৫। আল-কুরআনে কিতাল শব্দের অর্থ।

আল-কুরআন। '

(ক) “আর যুদ্ধ করো আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথেযারা যুদ্ধ করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা-১৯০)

(খ) “আর মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো সমবেতভাবে যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে সমবেতভাবে।” (সূরা তাওবা-৩৬)।

উল্লেখিত আয়াত দুটিতে যে সম্মুখ যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে তা শুধুমাত্র রাষ্ট্র প্রধানই ঘােষনা করতে পারেন। কোন ব্যক্তি নিজস্ব ভাবে এ ধরনের মানুষ হত্যার কিংবা যুদ্ধের আদেশ দিতে পারে না।

চরআন ও হাদিসের আলোকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মােকাবেলায় আমাদের করণীয়।

 

ক। জনগণকে রাষ্ট্রনায়কদের আনুগত্য করার শিক্ষা।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মােকাবেলার প্রথম করণীয় হলো জনগণকে রাষ্ট্রনায়কের আনুগত্য করার শিক্ষা দিতে হবে। আর এটা করা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেনমুমিনগন! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রাসূলের ও তোমাদের মধ্যে ব্যায়আ মারে। এ প্রসংগে রাসূল (সাঃ) বলেনকোন ব্যক্তি পছন্দ করুক অথবা অপছন্দ করুক তার প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের নির্দেশ শ্রবন করা এবং অনুগত্য করা ওয়াজিব।

 

খ। ধর্মের সঠিক শিক্ষার প্রসার।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশুদ্ধ নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে এবং ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা জনগণের সামনে পেশ করতে হবে।

গ। ব্যাপক মটিভেশন।

বর্তমান প্রিন্টইলেকট্রনিক ইন্টারনেটফেসবুক ইত্যাদি মিডিয়ার মাধ্যমে জঙ্গি ও

পবাদের প্রান্ত ধারণা তুলে ধরতে হবে। এটা জান্নাতের পথ নয়জাহান্নামের পথ বিষয়টি বুঝতে হবে।

ঘ। অভিভাবকদের দায়িত্ব।

অভিভাবকদের লক্ষ্য রাখতে হবে সন্তান কি করছেকোন শ্রেণির লোকদের সাথে মেলামেশা করছে। যদি সন্দেহ হয় তাহলে ওই পথ থেকে ফেরাতে হবে।

ঙ। শিক্ষকদের দায়িত্ব।

শিক্ষকগণ ক্লাসে বুঝবেন যারা সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তারা ইসলামের দুশমন।

চ। আলেমপীর ও ওলামা মাশায়েখদের ভূমিকা।

বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলসেমিনারসিম্পােজিয়াম করে মানুষকে ইসলামের সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে হবে।

ছ। মসজিদের ইমাম ও খতিবদের ভূমিকা।

এক সাথে দেশের সকল মসজিদে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী বক্তব্য কুরআন ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরতে হবে।

জ। সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশাজীবিদের ভূমিকা।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইসলামের দুশমনবিষয়টি সকল শ্রেণি ও পেশাজীবী মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।

ঝ। সমাজের হঠাৎ কেউ অতি ধার্মিক হলে তা লক্ষ্য করতে হবে।

সমাজের কেউ হঠাৎ অতি ধার্মিক কিংবা ধর্মের বিষয়ে কঠোরতা প্রদর্শন করলে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

ঞ। প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা আইনের প্রয়োগ।

সর্বোপরি কোনভাবেই কাউকে এই ভ্রান্ত পথ থেকে ফেরাতে না পারলে আইনের কঠোর প্রয়ােগের মাধ্যমে তাকে ফেরাতে হবে।।

৭। উপসংহার। ইসলাম শান্তি সৌহার্দ ও সহনশীলতার ধর্ম। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপনে। ইসলাম বিশ্বাসী! কোন ধরনের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইসলাম সমর্থন করে না। বরং সকল প্রকার জঙ্গি ও সন্ত্রাসী। কার্যকলাপ পৃথিবী থেকে উৎপাটনের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “কেউ যদি কাউকে হত্যা। করেসে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। আর যদি কেউ কাউকে জীবন দান করেতবে সে যেন সমস্ত মানুষকে জীবন দান করল।” (সূরা মায়েদা-৩২) কাজেই যারা ইসলামের নামে আত্মঘাতী বোমা হামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষ হত্যা করে ইসলাম কায়েম করতে চায় তারা প্রকৃত পক্ষে ইসলামের সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ও বিভ্রান্ত। এ সকল সন্ত্রাসীদের দ্বারা ইসলাম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা যে পথে অগ্রসর হচ্ছে তা জাহান্নামের পথ। আসুন আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদেরকে প্রতিহত করি।

 



[1]মুআহাদ বলতে যে বা যাদের সাথে আহ্দ বা চুক্তি হয়েছে তাদেরকে বুঝায়। ফিকহী ভাষায় সে যিম্মি হোক বা সুলাহকারী মুআহাদ বা মুসতামান (আশ্রয় গ্রহণকারী)। যারা মুসলিম দেশে ভিসা নিয়ে অন্য ভাষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে থাকছে তারা যে মুআহাদের অন্তর্ভুক্ত এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

No comments:

Post a Comment