Wednesday, December 22, 2021

পরকালে যে সব প্রশ্ন করা হবে

 


ভূমিকা :

প্রত্যেক মুসলমান এ কথা বিশ্বাস করে যে দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন নয়। মৃত্যুর পর রয়েছে অনন্তকালের জীবন। ইসলামের পরিভাষায় সেটাকে আখিরাত বা পরকাল বলা হয়। পরকালে দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব-নিকাশ হবে। ভালো-মন্দ কাজের প্রতিদান ও প্রতিফল দেওয়া হবে। পরকালে গোটা জীবনের প্রতিটি কাজ নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। পরকালে সব মানুষ বিশেষভাবে যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হবেসেগুলোর কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলো

১. কবরে তিন প্রশ্ন:

পরকালের প্রথম ধাপ হলো কবর। কবরে বান্দাকে তিনটি বিশেষ প্রশ্ন করা হবে। বারা বিন আজেব (রা.) থেকে বর্ণিতরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনকবরে মানুষকে তিনটি প্রশ্ন করা হবে।

مَنْ رَبُّكَ، وَمَا دِينُكَ، وَمَنْ نَبِيُّكَ.

এক. তোমার রব কেদুই. তোমার দ্বিন কীতিন. এই লোকটি কে ছিলেনযাকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল?

(আবু দাউদহাদিস : ৪৭৫৩তিরমিজিহাদিস : ৩১২০)

 

কবরবাসী যদি মুমিন হয়তাহলে এসব প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে পারবে। আর যদি কাফির হয়তাহলে বলবেআফসোস! আমি কিছুই জানি না।

২. ছালাত সম্পর্কে প্রশ্ন:

হক দুপ্রকার। এক. আল্লাহর হক। দুই. বান্দার হক। আল্লাহর হকগুলির মধ্যে ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হিসাব নেয়া হবে ছালাতের। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) বলেনআমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছিতিনি বলেন,

«إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ النَّاسُ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ أَعْمَالِهِمُ الصَّلَاةُ»، قَالَ: " يَقُولُ رَبُّنَا جَلَّ وَعَزَّ لِمَلَائِكَتِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ: انْظُرُوا فِي صَلَاةِ عَبْدِي أَتَمَّهَا أَمْ نَقَصَهَا؟ فَإِنْ كَانَتْ تَامَّةً كُتِبَتْ لَهُ تَامَّةً، وَإِنْ كَانَ انْتَقَصَ مِنْهَا شَيْئًا، قَالَ: انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ؟ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعٌ، قَالَ: أَتِمُّوا لِعَبْدِي فَرِيضَتَهُ مِنْ تَطَوُّعِهِ، ثُمَّ تُؤْخَذُ الْأَعْمَالُ عَلَى ذَاكُمْ "

নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন মানুষের আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।’ রাসুল (সা.) আরো বলেনআমাদের রব ফেরেশতাদের বলবেনঅথচ তিনি সর্বাধিক অবগততোমরা আমার বান্দার নামাজ দেখোসে তা পরিপূর্ণ করেছেনাকি অসম্পূর্ণ রেখেছে। যদি পরিপূর্ণ হয়তাহলে পূর্ণই লেখা হবে। আর যদি তাতে কিছু কমতি থাকেতাহলে তিনি বলবেনতোমরা দেখো আমার বান্দার কোনো নফল (নামাজ) আছে কি না। যদি তার নফল নামাজ থাকে তিনি বলবেনআমার বান্দার ফরজের ঘাটতিকে নফল দ্বারা পূর্ণ করো। অতঃপর এভাবেই অন্য আমলসমূহকে গ্রহণ করা হবে। (আবু দাউদহাদিস : ৮৬৪)

إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلاَتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ، فَإِنْ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ، قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الفَرِيضَةِ، ثُمَّ يَكُونُ سَائِرُ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ.

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কারো নামাজ যদি সঠিক হয়তাহলে সে সফলকাম ও কৃতকার্য হবে। আর নামাজ যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (তিরমিজিহাদিস : ৪১৩নাসাঈহাদিস : ৪৬৫)

 

অর্থা ছালাত যদি শুদ্ধ হয়রুকূসিজদাক্বিয়াম-কুঊদখুশু-খুযূ সহ সময় মত আদায় করে। আর যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তথা আদায় করেনি অথবা অশুদ্ধ হয়েছে অথবা গৃহীত হয়নিতাহলে সে ছওয়াব লাভে ব্যর্থ হবে এবং শাস্তি ভোগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আর বান্দার হকগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম বিচার করা হবে অন্যায় রক্তপাত বা হত্যার। যেমন ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিততিনি বলেনরাসূল (ছাঃ) বলেন,

أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ الصَّلَاةُ، وَأَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ فِي الدِّمَاءِ-

সর্বপ্রথম বান্দার ছালাতের হিসাবে নেয়া হবে। আর মানুষের পরস্পরের মাঝে সর্বপ্রথম বিচার করা হবে রক্তপাত বা অন্যায় হত্যার।[4] উল্লেখ্যহাদীছের আলোকে বুঝা যায় যেআল্লাহর হক ও বান্দার হকের মধ্যে সর্বপ্রথম আল্লাহর হকের হিসাব নেয়া হবে।


৩. বিশেষ পাঁচ বিষয়ে প্রশ্ন

ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিতরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

لاَ تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلاَهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ.

কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত আদম সন্তানের পা তার প্রতিপালকের সামনে নড়বে না। (তাকে প্রশ্ন করা হবে) তার জীবনকাল সম্পর্কেসে তা কিভাবে কাটিয়েছে। তার যৌবনকাল সম্পর্কেসে তা কিভাবে শেষ করেছে। তার সম্পদ সম্পর্কেসে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে। আর সে যে জ্ঞান অর্জন করেছেসে বিষয়ে কী আমল করেছে।’ (তিরমিজিহাদিস : ২৪১৬)


৪. আল্লাহর নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন:

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দুনিয়াতে অসংখ্য নেমত দান করেছেন। তিনি বলেনوَإِن تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللهِ لَا تُحْصُوْهَا ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেমতকে গণনা করতাহলে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না (নাহল ১৬/১৮)

আর এ সকল নেমত সম্পর্কে তিনি তাঁর বান্দাদের জিজ্ঞেস করবেনযাতে সে তা স্বীকৃতি দেয় এবং এর হক আদায় করেছে কি না তা জানতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন,

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ

তোমরা সেদিন অবশ্যই নেমতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (তাকাছুর ১০২/৮)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত,

عَن أبي هريرةَ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْم وَلَيْلَة [ص:1225] فَإِذَا هُوَ بِأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ فَقَالَ: «مَا أَخْرَجَكُمَا مِنْ بُيُوتِكُمَا هَذِهِ السَّاعَةَ؟» قَالَا: الْجُوعُ قَالَ: «وَأَنَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَخْرَجَنِي الَّذِي أَخْرَجَكُمَا قُومُوا» فَقَامُوا مَعَهُ فَأَتَى رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ فَإِذَا هُوَ لَيْسَ فِي بَيْتِهِ فَلَمَّا رَأَتْهُ المرأةُ قَالَت: مرْحَبًا وَأهلا فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيْنَ فُلَانٌ؟» قَالَتْ: ذَهَبَ يَسْتَعْذِبُ لَنَا مِنَ الْمَاءِ إِذْ جَاءَ الْأَنْصَارِيُّ فَنَظَرَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَصَاحِبَيْهِ ثُمَّ قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ مَا أَحَدٌ الْيَوْمَ أكرمَ أضيافاً مني قَالَ: فانطَلَق فَجَاءَهُمْ بِعِذْقٍ فِيهِ بُسْرٌ وَتَمْرٌ وَرُطَبٌ فَقَالَ: كُلُوا مِنْ هَذِهِ وَأَخَذَ الْمُدْيَةَ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِيَّاكَ وَالْحَلُوبَ» فَذَبَحَ لَهُمْ فَأَكَلُوا مِنَ الشَّاةِ وَمِنْ ذَلِكَ الْعِذْقِ وَشَرِبُوا فَلَمَّا أَنْ شَبِعُوا وَرَوُوا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذَا النَّعِيمِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمُ الْجُوعُ ثُمَّ لَمْ تَرْجِعُوا حَتَّى أَصَابَكُمْ هَذَا النعيمُ» . رَوَاهُ مُسلم.

রাসূল (ছাঃ) একদা দিনে অথবা রাতে বেরিয়ে পড়েন। হঠা আবু বকর ও উমরের সাথে তার দেখা হল। তিনি তাদের দুজনকে বললেন, ‘কোন প্রয়োজন তোমাদেরকে এই সময়ে বাড়ি থেকে বের করেছে’? তারা বললেনহে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ক্ষুধা। তিনি বললেন, ‘আমিও তাই। সেই সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছেআমাকে সে জিনিসই ঘর থেকে বের করেছে যা তোমাদেরকে বের করেছে। চল দেখি। ফলে তাঁরাও তাঁর সাথে চলতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তারা একজন আনছারী লোকের বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। দেখলেন তিনি বাড়িতে নেই। তবে তার স্ত্রী রাসূল (ছাঃ)-কে দেখতে পেয়ে বললেনমারহাবা! সুস্বাগতম! রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেনঅমুক কোথায়তিনি বললেনআমাদের জন্য সুস্বাদু পানি আনতে গেছেন। ঠিক তখনি আনছারী লোকটি আসলেন। এসে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর দুই সাথীকে দেখে বললেনআল-হামদুলিল্লাহ! আজ আমার চেয়ে সম্মানিত অতিথি আর কেউ পায়নি। বর্ণনাকারী বলেনতারপর তিনি গিয়ে এক গুচ্ছ ফল নিয়ে এলেনযাতে রয়েছে শুকনোপাকা ও কাঁচা খেজুর। তারপর বললেনআপনারা এগুলি থেকে খেতে থাকুন। এই বলে তিনি ছুরি নিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, ‘সাবধান দুধওয়ালা (ছাগল) যবাই করো না। তিনি তাঁদের জন্য (ছাগল) যবেহ করলেন এবং তারা সেই ছাগলের গোস্ত ও থোকা থেকে ফল খেলেন এবং পানও করলেন। যখন তারা তৃপ্ত ও পিপাসামুক্ত হলেনতখন রাসূল (ছাঃ) আবূ বকর ও উমরকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘সেই সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছেতোমরা এই নেমত সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। ক্ষুধা তোমাদেরকে বাড়ি থেকে বের করেছিলঅতঃপর তোমরা ফেরার পূর্বেই এই নেমত পেয়ে ধন্য হলে মুসলিম হা/২০৩৮মিশকাত হা/৪২৪৬।

তিরমিযীতে এসেছেরাসূল (ছাঃ) বলেন,

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مِنَ النَّعِيمِ الَّذِي تُسْأَلُونَ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ظِلٌّ بَارِدٌ وَرُطَبٌ طَيِّبٌ وَمَاءٌ بَارِدٌ.

সেই সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছেক্বিয়ামতের দিন যে সকল নেমত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে তা হশীতল ছায়াপবিত্র খেজুর ও ঠান্ডা পানীয়।[7]

রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন,

إِنَّ أَوَّلَ مَا يُسْأَلُ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي الْعَبْدَ مِنْ النَّعِيمِ أَنْ يُقَالَ لَهُ أَلَمْ نُصِحَّ لَكَ جِسْمَكَ وَنُرْوِيَكَ مِنْ الْمَاءِ الْبَارِدِ.

নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন বান্দা সর্বপ্রথম যে নেমত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে তা হল তাকে বলা হবেআমরা কি তোমার শরীরকে সুস্থ রাখিনি এবং ঠান্ডা পানি দ্বারা তোমাকে পরিতৃপ্ত করিনি’?[8]

আর নেমতের হক হল এর শুকরিয়া আদায় করাঅর্থা আল্লাহর নেমত সম্পর্কে বলাতাঁর আনুগত্যে এবং বৈধ কাজে সেগুলিকে ব্যবহার করা। যদি কোন ব্যক্তি এগুলি করেতাহলে সে যেন এসবের হক আদায় করল এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। সে আল্লাহর সন্তষ্টি লাভেও ধন্য হবে। আর যদি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করেতাহলে সে যেন নেমতকে অস্বীকার করল।

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতরাসূল (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ الله لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا، أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا.

আল্লাহ্ তাআলা ঐ বান্দার ওপর অবশ্যই সন্তষ্ট হনযে কোন খাদ্য খেলে এর জন্য তাঁর প্রশংসা করে। অথবা কোন পানীয় পান করলে এর জন্য তাঁর প্রশংসা করে


৫. অঙ্গ-প্রতঙ্গ সম্পর্কে প্রশ্ন:

আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

وَلاَ تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولًا

যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না। নিশ্চয়ই কানচোখহৃদয় প্রত্যেকটির বিষয়ে তোমরা (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে (বনী ইসরাঈল ১৭/৩৬)

কাতাদাহ (রহঃ) বলেন,

 لا تقل رأيت ولم تر، وسمعت ولم تسمع، وعلمت ولم تعلم، فإن الله تعالى سائلك عن ذلك كله

তুমি বল না যেআমি দেখেছি অথচ আদৌ দেখনি। আমি শুনেছি অথচ আদৌ শুননি। আমি জানি অথচ জানো না। কেননা আল্লাহ তাআলা এসবকিছু সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করবেন

কর্ণচক্ষু ও অন্তর এসবকিছুই মহান রবের দেয়া বড় নেমত। আর এগুলি সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন আমাদের জিজ্ঞেস করা হবেসেগুলি কি আল্লাহর আনুগত্যে ও সকাজে ব্যবহার করে এগুলির শুকরিয়া আদায় করা হয়েছেনা এগুলি আল্লাহর অবাধ্য ও পাপাচারের কাজে লাগানো হয়েছেসুতরাং এগুলির সদ্ব্যবহার করতঃ শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কিন্ত অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে গাফেল। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ هُوَ الَّذِي أَنشَأَكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ

বলতিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে দান করেছেন কর্ণচক্ষু ও হৃদয়। কিন্তু তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর (সূরা মুলক ৬৭/২৩)


৬. জিহাদইলম ও সম্পদের প্রশ্ন:

ক্বিয়ামতের দিন বান্দাকে আল্লাহ প্রদত্ত যে সকল বড় নেমত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে তন্মধ্যে রয়েছে ইলমসম্পদ ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। তার কাছে জানতে চাওয়া হবেসে এগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহর যে হক রয়েছে তা যথাযথ আদায় করেছে কি-নাসে কি এগুলির হেফাযত করেছেনা সেগুলি নষ্ট করেছে?

«إِن أول النَّاس يقْضى عَلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أَمر بِهِ فسحب على وَجهه حَتَّى ألقِي فِي النَّارِ وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعلم ليقال عَالِمٌ وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئٌ فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ [ص:72] نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ هُوَ جَوَادٌ فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিততিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছিতিনি বলেনক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে লোকটির ফায়ছালা করা হবে সে হল একজন শহীদ। তাকে নিয়ে আসা হবে। তাকে তার নেমতগুলি স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে এবং সেও তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তাকে বলবেনতুমি এবিষয়ে কি আমল করেছসে বলবেআমি তোমার রাস্তায় যুদ্ধ করেছিএমনকি শাহাদত বরণও করেছি। তিনি বলবেনতুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি যুদ্ধ করেছ এজন্য যেতোমাকে যেন বীর বলা হয়। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর নির্দেশ দেয়া হবে তাকে টেনেহেঁচড়ে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে। ফলে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর এক ব্যক্তি যে জ্ঞান অর্জন করেছে এবং তা অন্যকে শিক্ষাও দিয়েছে। আর সে কুরআন তিলাওয়াত করতো। তাকে নিয়ে আসা হবে। তিনি তাকে তার নেমতগুলি স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সে তা স্মরণ করবে। তিনি তাকে বলবেনতুমি এসব নেমতের কি আমল করেছসে বলবেআমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা অন্যকেও শিক্ষা দিয়েছি। তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলাওয়াতও করেছি। তিনি বলবেনতুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি জ্ঞান অর্জন করেছ যাতে তোমাকে বলা হয় সে আলিম এবং কুরআন পড়েছ যাতে তোমাকে বলা হয় সে ক্বারী। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর নির্দেশ দেয়া হবে তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেফলে তাই করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ অনেক প্রাচুর্য দান করেছেন। সর্বপ্রকার সম্পদ তাকে দিয়েছেন। তাকেও নিয়ে আসা হবে। তাকে তার নেমতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে এবং সেও তা স্মরণ করবে। তাকে বলবেনতুমি এসবের ব্যাপারে কি আমল করেছসে বলবেযে পথে খরচ করলে তুমি সন্তষ্ট হও এমন সব ক্ষেত্রে আমি তোমার সন্তষ্টির জন্যে খরচ করেছি। তিনি বলবেনতুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি তা করেছ যাতে তোমাকে বলা হয় দানবীর। সুতরাং তা বলা হয়েছে। অতঃপর নির্দেশ দেয়া হবে তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেফলে তাই করা হবে মুসলিম হা/১৯০৫মিশকাত হা/২০৫।

৭. ওয়াদা ও অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন:

ক্বিয়ামতের দিন আমাদের দেয়া অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَوْفُواْ بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولًا

আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (বনী ইসরাঈল ১৭/৩৪)। তিনি আরো বলেন,

وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللهِ مَسْؤُولًا-

অথচ তারা ইতিপূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যেতারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। বস্ত্ততঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে (আহযাব ৩৩/১৫)


৮. কুফর ও শিরক সম্পর্কে প্রশ্ন:

দুনিয়াতে যারা কুফরী করে ও আল্লাহর সাথে শরীক করেতাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। মহান আল্লাহ্ বলেন,

تَاللهِ لَتُسْأَلُنَّ عَمَّا كُنتُمْ تَفْتَرُونَ  

আল্লাহর কসম! তোমরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করসে বিষয়ে অবশ্যই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে (নাহল ১৬/৫৬)

তিনি আরো বলেন,

ثُمَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُخْزِيهِمْ وَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنْتُمْ تُشَاقُّونَ فِيهِمْ قَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ إِنَّ الْخِزْيَ الْيَوْمَ وَالسُّوءَ عَلَى الْكَافِرِينَ

এরপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদের লাঞ্ছিত করবেন এবং বলবেনকোথায় আমার শরিকরাযাদের কারণে তোমরা (নবীদের সঙ্গে) শত্রুতা করতেতখন (ফেরেশতা বা মুমিনরা) যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছেতারা বলবেনিশ্চয়ই সব লাঞ্ছনা ও অমঙ্গল আজ শুধু কাফিরদের জন্যই।’ (সুরা : নাহলআয়াত : ২৭)।

 

৯. ফেরেশতাগণের প্রতি মিথ্যারোপ সম্পর্কে :

দুনিয়াতে এক শ্রেণীর মানুষ ফেরেশতাগণের প্রতি মিথ্যারোপ করে এবং তাদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেতারা নাকি নারী জাতি। এমনকি তারা তাদেরকে আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করে। ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। এমর্মে মহান আল্লাহ্ বলেন,

وَجَعَلُوا الْمَلَائِكَةَ الَّذِينَ هُمْ عِبَادُ الرَّحْمَنِ إِنَاثًا أَشَهِدُوا خَلْقَهُمْ سَتُكْتَبُ شَهَادَتُهُمْ وَيُسْأَلُونَ

আর তারা ফেরেশতাদের নারী গণ্য করেযারা দয়াময়ের বান্দা। তবে কি তারা তাদের সৃষ্টির সময় উপস্থিত ছিলতাদের (এখনকার) সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা হবে এবং (কিয়ামতের দিন) তারা জিজ্ঞাসিত হবে (যুখরুফ ৪৩/১৯)


১০. রাসূলগণের দাওয়াতে সাড়া দেয়া সম্পর্কে:

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। ক্বিয়ামতের দিন তিনি তাঁদের উম্মতদেরকে জিজ্ঞেস করবেনতারা তাঁদের দাওয়াত কবুল করেছে কি-নাএমনকি তিনি তাঁর রাসূলগণকেও জিজ্ঞেস করবেনতাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত রিসালতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি-নাতাঁরা স্বীয় উম্মতদের নিকট তা পৌঁছে দিয়েছেন কি-নামহান আল্লাহ বলেন,

 ماذا أجبتم المرسلين.

সেদিন তাদের ডেকে আল্লাহ বলবেননবীদের আহবানে তোমরা কিরূপ সাড়া দিয়েছিলে?’ (ক্বাছাছ ২৮/৬৫)

তিনি আরো বলেন,

فَلَنَسْأَلَنَّ الَّذِينَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْأَلَنَّ الْمُرْسَلِينَ.

অতঃপর যাদের কাছে রাসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে এবং রাসূলগণকে অবশ্যই আমরা (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসাবাদ করব (রাফ ৭/৬)

এ আয়াতের তাফসীরে ইবনু জারীর ত্বাবারী (রহঃ) বলেন, ‘যাদের নিকট আমি আমার রাসূলগণকে পাঠিয়েছি তাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবআমার পক্ষ থেকে রাসূলগণ তাদের নিকট যে আদেশ-নিষেধ নিয়ে এসেছিলেনতারা তা অনুযায়ী কি আমল করেছেআমি তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছি তারা কি তা পালন করেছেআমি যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করেছিলাম তারা কি তা থেকে বিরত থেকেছে এবং আমার আনুগত্য মেনে নিয়েছেনা তারা আমার অবাধ্য হয়েছে এবং সেগুলির বিরোধিতা করেছেআমি যে সকল রাসূলগণকে উম্মতদের নিকট পাঠিয়েছি তাঁদেরকেও জিজ্ঞেস করবতাঁরা কি তাদের নিকট আমার রিসালত পৌঁছে দিয়েছেনতাদের ব্যাপারে আমি যে দায়িত্ব দিয়েছিলাম তা কি আদায় করেছেননা তাঁরা এ ব্যাপারে কমতি করেছেনফলে তাঁরা অবহেলা করেছেন এবং তাদের নিকট তা পৌঁছে দেননি’? তাফসীরে ত্বাবারী১২/৩০৫-৩০৬ পৃঃ।

উপসংহার

পরিশেষে আল্লাহ্ তাআলা যেন আমাদেরকে দ্বীনের ওপরে চলা এবং খাঁটি মুসলিম ও মুমিন হয়ে মৃত্যুবরণ করার তাওফীক্ব দান করেন। স আমল করা এবং কবর সহ পরকালের সকল স্তরে হিসাব সহজ করে দেন। ক্বিয়ামতের দিন যাবতীয় ফিনা থেকে আমাদের রক্ষা করে পুলছিরাত পার হওয়ার সৌভাগ্য দান করেন। তার অশেষ রহমতে আমাদেরকে তাঁর জান্নাত লাভে ধন্য করেন-আমীন।

No comments:

Post a Comment