ভুমিকাঃ
সৈনিক জীবন মানেই পরম দেশাত্মবোধে সচেতন এক শৃংখলা পূর্ণ বিপুল কর্মময় জীবন। এই কর্মময় সাংগঠনিক জীবনে একজন সেনা সদস্যকে অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয় । তম্মধ্যে সহকর্মীদের প্রতি কর্তব্য পালন ও ভাল ব্যবহার একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তা’আলার বলেন,
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا *
আর তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করো না । পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাতœীয়, এতীম-মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সহকর্মী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও সৎ ও সদয় ব্যবহার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক-গর্বিতজনকে পছন্দ করেন না। (সূরা নিসাঃ ৩৬)
সহকর্মীর সংগাঃ
ক। আরবিতে (صاحب بالذنب)সাহেবে বিল জাম্বের শাব্দিক অর্থ হলো সহকর্মী। সহকর্মী বলতে সেসব লোককে বোঝায়, যারা কোনো সাধারণ বা বিশেষ বৈঠক বা অধিবেশনে আমাদের সঙ্গে উপবেশন করে থাকে। এতে সেসব সফরসঙ্গীও অন্তর্ভুক্ত, যারা রেল, জাহাজ, বাস, মোটর প্রভৃতি যানবাহনে পাশাপাশি বসে ভ্রমণ করে। কোনো কোনো তাফসিরকার বলেছেন, প্রতিটি লোকই সাহেবে বিল জাম্বের অন্তর্ভুক্ত যে কোনো কাজে, কোনো পেশায় বা কোনো বিষয়ে আপনার সঙ্গে জড়িত বা আপনার অংশীদার। তা শিল্পশ্রমেই হোক অথবা অফিস-আদালতের চাকরিতে হোক কিংবা কোনো সফরে বা স্থায়ী বসবাসেই হোক (রুহল-মাআনি)।
খ। মোদ্দাকথা হলো ‘কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার উদ্দেশ্য সিদ্ধি, লক্ষ্য অর্জন, কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য সম্মিলিতভাবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যারা কার্য সম্পাদন করে তাদেরকে সহকর্মী বলে।’
সহকর্মীর প্রকারভেদঃ
সহকর্মী দ্ইু ভাগে বিভক্ত। যথাঃ
(ক) উর্ধ্বতন সহকর্মী
(খ) অধস্তন সহকর্মী।
সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারের ধরণঃ
সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারের ধরন তিনটি।
ক। প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার ।
খ। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার ।
গ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার।
অধস্তন সহকর্মীর সাথে উর্ধ্বতন সহকর্মীর ভাল ব্যবহারের গুরুত্বঃ
ক। উর্ধ্বতন সহকর্মী অধিনস্তদের রক্ষকঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
৭১৩৮ - عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَاঃ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَঃ أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ * (بخارى)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ঈমাম বা শাসক-প্রশাসক একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সর্ম্পকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তাকে তার সে দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘর-সংসার এবং সন্তানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে এ দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে। খাদিম বা অধীনস্ত তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে একজন দায়িত্বশীল। সেদিন তাকেও তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সহীহ বুখারীঃ ৫৩৭৬)
খ। উর্ধ্বতন সহকর্মী অধিনস্তদের আমানতদারঃ
১৬ - (১৮২৫) عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَঃ قُلْتُঃ يَا رَسُولَ اللهِ، أَلَا تَسْتَعْمِلُنِي؟ قَالَঃ فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَى مَنْكِبِي، ثُمَّ قَالَঃ يَا أَبَا ذَرٍّ، إِنَّكَ ضَعِيفٌ، وَإِنَّهَا أَمَانَةُ، وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا، وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَ * (مسلم)
আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), আপনি আমাকে সরকারী কোন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার গর্দানে ধাক্কা মেরে বললেন- হে আবু জার, তুমি খুবই দূর্বল প্রকৃতির লোক, আর সরকারী পদ হলো একটি আমানত বিশেষ। এটা কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে। তবে যারা এর যথার্থ ব্যবহার করতে পারবে এবং তার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে তা যথাযথভাবে আদায় করবে তাদের কথা স্বতন্ত্র। (সহীহ মুসলিমঃ ৪/৪৬১৩)
গ। অধিনস্থদের প্রতি নরম ও কোমল ব্যবহারঃ
আল্লাহর ঘোষণা
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيْظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوْا مِنْ حَوْلِكَ-
‘আর আল্লাহর রহমতেই তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতে তাহ’লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত’ (সূরা আলে ইমরানঃ ৩/১৫৯)
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ شِمَاسَةَ، قَالَঃ أَتَيْتُ عَائِشَةَ أَسْأَلُهَا عَنْ شَيْءٍ، فَقَالَتْঃ مِمَّنْ أَنْتَ؟ فَقُلْتُঃ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ مِصْرَ، فَقَالَتْঃ كَيْفَ كَانَ صَاحِبُكُمْ لَكُمْ فِي غَزَاتِكُمْ هَذِهِ؟ فَقَالَঃ مَا نَقَمْنَا مِنْهُ شَيْئًا، إِنْ كَانَ لَيَمُوتُ لِلرَّجُلِ مِنَّا الْبَعِيرُ فَيُعْطِيهِ الْبَعِيرَ، وَالْعَبْدُ فَيُعْطِيهِ الْعَبْدَ، وَيَحْتَاجُ إِلَى النَّفَقَةِ، فَيُعْطِيهِ النَّفَقَةَ، فَقَالَتْঃ أَمَا إِنَّهُ لَا يَمْنَعُنِي الَّذِي فَعَلَ فِي مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ أَخِي أَنْ أُخْبِرَكَ مَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ فِي بَيْتِي هَذَاঃ اللهُمَّ، مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ، فَاشْقُقْ عَلَيْهِ، وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَرَفَقَ بِهِمْ، فَارْفُقْ بِهِ * (مسلم)
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, হে আল্লাহ্! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়। অতঃপর সে অধিনস্থদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করে তুমি তাদের সাথে কঠোরতা প্রদর্শন কর। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে অধিনস্থদের প্রতি নরম ও কোমল আচরণ করে তুমি তাদের প্রতি কোমল ও নরম আচরণ কর। (সহীহ মুসলিমঃ ৫/৪৬১৬)
ঘ। অধিনস্থদের প্রতি সু ধারণা পোষণঃ
عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَঃ خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ، وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ، وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ، وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ * (مسلم)
আউফ ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে উত্তম শাসক তারা যাদেরকে তোমরা ভালবাস ও তারাও তোমাদের ভালবাসে। তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট শাসক তারা, যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর এবং তারাও তোমাদেরকে অপছন্দ করে এবং তোমরা তাদের প্রতি অভিসম্পাত কর এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। (সহীহ মুসলিমঃ ১৭/৪৬৯৮)
ঙ। সৎ পরামর্শদাতা নিয়োগ ও পরামর্শ গ্রহণঃ
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ *
যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা নামায কায়েম করে ; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে। (সূরা শুরা ৪২/ ৩৮)
২৯৩২ - عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْঃ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَঃ إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِالْأَمِيرِ خَيْرًا جَعَلَ لَهُ وَزِيرَ صِدْقٍ، إِنْ نَسِيَ ذَكَّرَهُ، وَإِنْ ذَكَرَ أَعَانَهُ، وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهِ غَيْرَ ذَلِكَ جَعَلَ لَهُ وَزِيرَ سُوءٍ، إِنْ نَسِيَ لَمْ يُذَكِّرْهُ، وَإِنْ ذَكَرَ لَمْ يُعِنْهُ * (ابو داود) صحيح
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ যখন কোন শাসকের কল্যাণ সাধনের ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য সত্যের পরামর্শ দানকারী নিযুক্ত করে দেন। শাসক কোন বিষয় ভূলে গেলে সে তাকে তা ম্মরণ করিয়ে দেয় এবং তা তার ম্মরণে থাকলে সে তাকে সাহায্য ও সহায়তা করে । (আবু দাঊদঃ ২৯৩২)
উর্ধ্বতন সহকর্মীর সাথে অধস্তন সহকর্মীর ভাল ব্যবহারঃ
ক। আনুগত্যঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا *
উর্ধ্বতন সহকর্মীর আনুগত্য করা অধিন্তদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য। হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা নেতা তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তোমরা আল্লাহ্ ও তার রাসূলের আদেশের প্রতি ফিরে আসো, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়েও উত্তম। (সূরা নিসাঃ ৫৯)
৪১৫৫ - عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَঃ عَلَيْكَ بِالطَّاعَةِ فِي مَنْشَطِكَ وَمَكْرَهِكَ، وَعُسْرِكَ وَيُسْرِكَ، وَأَثَرَةٍ عَلَيْكَ * (نسائى) صحيح
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, সুদিনে ও দুর্দিনে, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিতে এবং তোমার অধিকার খর্ব হওয়া বা তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে শাসকের নির্দেশ শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা তোমার জন্য অপরিহার্য । (নাসাঈঃ ৪১৫৫)
খ। অবাধ্য না হওয়াঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَঃ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَঃ مَنْ أَطَاعَنِي، فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَانِي، فَقَدْ عَصَى اللَّهَ، وَمَنْ أَطَاعَ الْإِمَامَ، فَقَدْ أَطَاعَنِي، وَمَنْ عَصَى الْإِمَامَ، فَقَدْ عَصَانِي * (ابن ماجة) صحيح
আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্য হলো সে আল্লাহরই অবাধ্য হলো। অনুরপ যে আমীরের আনুগত্য করলো, সে আমারই আনুগত্য করলো এবং যে আমীরের অবাধ্য হলো, সে আমারই অবাধ্য হলো। (ইবনে মাজাহঃ ২৮৫৯)
গ। কল্যাণ কামনা করাঃ
৯৫ - (৫৫) عَنْ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَঃ الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَاঃ لِمَنْ؟ قَالَঃ لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ * (مسلم)
তামীদারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কল্যাণ কামনাই দীন। আমরা আরজ করলাম, কার জন্য কল্যাণ কামনা? তিনি বললেন, আল্লাহর, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসূলের, মুসলিম শাসক এবং মুসলিম জনগণের। (সহীহ মুসলিমঃ ৯৮)
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারঃ
ক। সহকর্মীদের প্রতি সর্ব প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে সৎ কাজের প্রতি আদেশ প্রদান এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ *
‘মুমিনগণ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তারা একে অপরকে সৎ কাজের আদেশ করে আর অসৎ কাজের নিষেধ করে।’ (সূরা তওবাঃ ৭১)
فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍঃ أَمَّا هَذَا فَقَدْ قَضَى مَا عَلَيْهِ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُঃ مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ * (مسلم)
আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি তাতে সে সক্ষম না হয়, তাহলে মুখের দ্বারা সে যেন তা প্রতিহত করে। যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা উক্ত কাজকে ঘৃনা করবে। আর এটা হলো ঈমানের নিম্নতম স্তর । (সহীহ মুসলিমঃ ৭৯)
খ। পরস্পর সম্মান প্রদর্শন ও স্নেহ করাঃ
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ قَالَঃ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَঃ لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ شَرَفَ كَبِيرِنَا * (ترمذى) صحيح
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বড়দের সম্মান করবে না এবং ছোটদের স্নেহ করবে না সে আমার দলভূক্ত নয়। (তিরমিযীঃ ১৯২০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيْرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا-
‘যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান বোঝে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাঊদঃ ৪৯৪৩; তিরমিযীঃ ১৯২০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
ارْحَمُوا مَنْ فِى الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِى السَّمَاءِ
‘যমীনে যে আছে তার প্রতি তোমরা দয়া কর, আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাঊদঃ ৪৯৪১; তিরমিযীঃ ১৯২৪; মিশকাতঃ ৪৯৬৯)
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের প্রতি ভাল ব্যবহারঃ
ক। ভ্রাতৃত্ব সর্ম্পক গড়ে তোলাঃ
সহকর্মীদের সাথে সুসর্ম্পক গড়ে তোলা প্রয়োজন। কর্ম ক্ষেত্রে একের সম্পর্ক অন্যের সাথে মধুর হলে কাজে শান্তি পাওয়া যায়। সর্ম্পক ভাল করার জন্য একের প্রতি অপরের অনেক কিছু করণীয় আছে। নিজ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েই তা নিরুপন করতে হয়। একে অপরকে এরুপ সমান মনে করতে পারলে সহকর্মীদের সাথে ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে । আল্লাহ তা’আলা বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ *
‘মুমিনরা পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহ্কে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও।’ (সূরা হুজুরাতঃ ১০)
খ। সহযোগিতার মনোভাব রাখাঃ
প্রত্যেক কাজে সহকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব রাখা অপরিহার্য কর্তব্য। আর সহযোগিতার ফলে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভবনা অত্যন্ত বেশী। আল্লাহ তা’আলার বানী,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَاتَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوااللَّهَ إِنَّ اللَّه شَدِيدُ الْعِقَابِ
‘সৎকর্ম ও আল্লাহ্র ভয়ে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহ্কে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।’ (সূরা মায়িদাঃ ২)
গ। স্বার্থপরতা পরিত্যাগ করাঃ
আল্লাহ তা’আলার বলেন,
وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ *
‘নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশরঃ ৯)
ঘ। পরমত সহিঞ্চুতাঃ
কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন চিন্তা ও মতের মানুষের অবস্থান। তাই নির্দিষ্ট কোন ব্যাপারে সকলের পক্ষে একই মত পোষণ করা সম্ভম নাও হতে পারে। তাই কোন ব্যাপারে ধৈর্য হারানো যাবেনা। প্রত্যেকের অবশ্যই ধৈর্যের সাথে অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান রক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَاأَيُّهَاالَّذِينَ آمَنُوااصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَ رَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, পরস্পর ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর এবং স্বীয় দায়িত্বে অবিচল থাকো, তাহলে তোমরা সফল হবে।’ (সূরা আলে-ইমরানঃ ২০০)
সহকর্মীর সঙ্গে ইসলাম যেমন আচরণের নির্দেশনা দিয়েছে
নিম্নে বিষয়ে ইসলামের কিছু নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
১। শুরুতে হাসিমুখে সুন্দর কথা বলা ও রাগ না করা
ইসলাম শুরু থেকেই মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এজন্য ইসলাম পারস্পরিক সাক্ষাতে হাসিমুখে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ (২৪) تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (২৫) وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ (২৬)
‘তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনঃ একটি সুন্দর কথা ভালো গাছের মতো, মাটিতে যার শিকড় বদ্ধমূল, আকাশে যার শাখা বিস্তৃত, যে গাছ অফুরন্ত ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণণা করেন যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। এবং নোংরা বাক্যের উদাহরণ হলো নোংরা বৃক্ষ। একে মাটির উপর থেকে উপড়ে নেয়া হয়েছে। এর কোন স্থিতি নেই।’ (সূরা ইবরাহীমঃ ২৪-২৬)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
لاَ تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوْفِ شَيْئًا وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ-
‘তোমরা কোন নেক কাজকে ছোট ভেবো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিখুশী মুখে সাক্ষাৎ করা হয়।’ (সহীহ মুসলিমঃ ২৬২৬; মিশকাতঃ ১৮৯৪)
আবু জর (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ।’ (তিরমিযীঃ ১৯৫৬)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
كُلُّ كَلِمَةٍ طَيِّبَةٍ صَدَقَةٌ-
‘প্রত্যেক ভালো কথাও ছাদাক্বা।’ (আল-আদাবুল মুফরাদঃ ৪২২)
তিনি আরো বলেন,
اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ، فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فَبِكَلِمَةٍ طَيِّبَةٍ-
‘তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকো, একটি খেজুর দিয়ে হ’লেও। আর যদি তুমি সেটাও না পাও তাহ’লে উত্তম কথা দ্বারা হ’লেও (আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা কর)।’ (সহীহ বুখারীঃ ৬০২৩, ৬৫৪০, ৬৫৬৩; সহীহ মুসলিমঃ ১০১৬; মিশকাতঃ ৫৮৫৭)
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ-
‘আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে অট্টহাসি করতে দেখিনি, যাতে তাঁর জিহবার তালু দেখা যায়। তিনি মৃদু হাসতেন।’ (সহীহ বুখারীঃ ৪৮২৮; মিশকাতঃ ১৫১২)
সেই সাথে রাগ পরিহার করবে। কেননা ক্রোধান্বিত হয়ে মানুষ অধিক ভুল করে থাকে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَوْصِنِى. قَالَ لاَ تَغْضَبْ. فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ لاَ تَغْضَبْ.
‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আরয করল, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার কথাটা পুনরাবৃত্তি করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেকবারই বললেন, রাগ করো না।’ (সহীহ বুখারীঃ ৬১১৬; তিরমিযীঃ ২০২০; মিশকাতঃ ৫১০৪)
২. সুসম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা
কর্মক্ষেত্রে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দের ভিত্তিতে নৈকট্য ও দূরত্ব কখনো কখনো মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أُرَاهُ رَفَعَهُ، قَالَঃ أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَا عَسَى أَنْ يَكُونَ بَغِيضَكَ يَوْمًا مَا، وَأَبْغِضْ بَغِيضَكَ هَوْنًا مَا عَسَى أَنْ يَكُونَ حَبِيبَكَ يَوْمًا مَا.
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘নিজের বন্ধুর সঙ্গে ভালোবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সাথেও শত্রু তার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।’ (তিরমিযীঃ ১৯৯৭)
৩. কাউকে বিশেষ অগ্রাধিকার নয়ঃ
কর্মক্ষেত্রে কোনো সহকর্মীকে যৌক্তিক কারণ ছাড়া অগ্রাধিকার না দেওয়াই উত্তম। বিশেষত কেউ যদি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন থাকে। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সবাই নিজেকে সবচেয়ে সম্মানী মনে করত।’ (মুখতারাতঃ ২/১৫)
৪. শোনাকথায় কান না দেওয়াঃ
শোনাকথা কান দিলে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো কথা শুনলে তা যাচাই করার আগে প্রতিক্রিয়া দেখান উচিত নয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
‘হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না বস এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সূরা হুজরাতঃ ৬)
৫. পরস্পরকে সহযোগিতা করাঃ
পারস্পরিক সাধ্যমত সহযাগিতা করবে এটা ইসলামের শিক্ষা। এতে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ সুন্দর হয় এবং সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ﴿المائدةঃ ٢﴾
‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।’ (সূরা মায়িদা, আয়াতঃ ২)
এর ফলে সে আল্লাহর সাহায্যের হকদার হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
وَمَنْ كَانَ فِى حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِى حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ،
‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত থাকেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি সমস্যা দূর করবে আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার সমস্যাগুলির একটি সমস্যা দূর করে দিবেন।’ (সহীহ বুখারীঃ ২৪৪২; সহীহ মুসলিমঃ ২৫৮০; মিশকাতঃ ৪৯৫৮)
তিনি আরো বলেন,
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُوْمًا
‘তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত হোক।’ (সহীহ বুখারীঃ ২৪৪৩-৪৪; তিরমিযীঃ ২২৫৫; মিশকাতঃ ৪৯৫৭)
অর্থাৎ সহকর্মী যদি অত্যাচারী হয় তবে তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে সাহায্য করতে হবে।
সাহায্য ও ঋণ চাইলে দিতে হবে। সহকর্মী পরামর্শ চাইলে সুপরামর্শ দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
إِذَا اسْتَنْصَحَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيَنْصَحْ لَهُ-
‘যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের নিকট উপদেশ চাইবে, তখন সে যেন তাকে উপদেশ দান করে।’ (বুখারী তা‘লীক; গায়াতুল মারামঃ ৩৩৩)
৬. অধীনস্থদের প্রতি সদাচরণ করাঃ
অধীনস্থদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
لاَ يَدْخُلُ الجَنَّةَ سَيِّئُ الْمَلَكَةِ.
‘অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে যেতে পারবে না।’ (তিরমিযীঃ ১৯৪৬)
৭. অন্যের দোষ প্রচার না করাঃ
মানুষের দোষ প্রচার করা নিন্দনীয় স্বভাব। বিশেষ প্রয়োজন ও অপারগতা ছাড়া মুমিন অন্যের দোষ প্রকাশ করবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَঃ مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ القِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ فِي الدُّنْيَا يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ، وَمَنْ سَتَرَ عَلَى مُسْلِمٍ فِي الدُّنْيَا سَتَرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ، وَاللَّهُ فِي عَوْنِ العَبْدِ مَا كَانَ العَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ.
‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুসলমানের দোষ-ক্রটিকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ক্রটি গোপন রাখবেন।’ (তিরমিযীঃ ১৯৩০)
অন্যের গোপনীয় বিষয় প্রকাশ না করা মুসলমানের জন্য অবশ্য করণীয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ قَدْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الإِيْمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لاَ تُؤْذُوْا الْمُسْلِمِيْنَ وَلاَ تُعَيِّرُوْهُمْ وَلاَ تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيْهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِىْ جَوْفِ رَحْلِهِ،
‘হে ঐ জামা‘আত, যারা মুখে ইসলাম কবুল করেছ কিন্তু অন্তরে এখনো ঈমান মযবূত হয়নি। তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দিবে না, তাদের লজ্জা দিবে না এবং তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হবে না। কেননা যে লোক তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ অনুসন্ধানে নিয়োজিত হবে আল্লাহ তা‘আলা তার গোপন দোষ প্রকাশ করে দিবেন। আর যে ব্যক্তির দোষ আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ করে দিবেন তাকে অপমান করে ছাড়বেন, সে তার উটের হাওদার ভিতরে অবস্থান করে থাকলেও।’ (মিশকাতঃ ৫০৪৪)
পারস্পরিক দোষ-ত্রুটি সংশোধন করে দেওয়াঃ
কোন লোকের মধ্যে দোষ-ত্রুটি পরিলক্ষিত হ’লে সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলতে হবে। যাতে সে সংশোধন হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন
الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ يَكُفُّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَيَحُوْطُهُ مِنْ وَرَائِهِ-
‘এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়না স্বরূপ। এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই। তারা একে অপরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে রক্ষা করে।’ (আবূ দাঊদঃ ৪৯১৮; মিশকাতঃ ৪৯৮৫)
৮. গোপন কথা গোপন রাখাঃ
কেউ যদি কোনো কথা গোপন রাখার অনুরোধ করেন তবে তা গোপন রাখবে। একান্ত অপারগতা ও সামগ্রিক কল্যাণ ছাড়া তা প্রকাশ করবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ الحَدِيثَ ثُمَّ التَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ.
কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলার পর আশেপাশে তাকালে তার উক্ত কথা (শ্রবণকারীর জন্য) আমানাত বলে গণ্য হবে।’ (তিরমিযীঃ ১৯৫৯)
তিনি আরো বলেন,
مَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ صُبَّ فِى أُذُنِهِ الآنُكُ،
‘যে ব্যক্তি কোন কওমের (গোপন) কথা শ্রবণ করবে, যা তারা অপসন্দ করে, তার কানে শীশা ঢেলে দেওয়া হবে।’
৯. মন্দ ধারণা পোষণ না করাঃ
সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কারো প্রতি মন্দ বা কু-ধারণা পোষণ করা নিষিদ্ধ। মন্দ ধারণা কর্মক্ষেত্রের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নষ্ট করে। তাই অন্য মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সুধারণা পোষণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা কোন কোন ধারণা পাপ’ (হুজুরাত ৪৯/১২)।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، وَلاَ تَحَسَّسُوا، وَلاَ تَجَسَّسُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا-
‘তোমরা অনুমান করা থেকে সাবধান হও। কেননা অনুমান অবশ্যই সর্বাপেক্ষা বড় মিথ্যা। আর তোমরা অন্যের দোষ অন্বেষণ করো না, গুপ্তচরবৃত্তি করো না, পরস্পরের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করো না এবং পরস্পরের সাথে হিংসা করো না। পরস্পরের ক্ষতি করার জন্য পেছনে লেগে থেকো না। আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (তিরমিযী ঃ ১৯৮৮)
১০. চুপ থাকা কম কথা বলা ও মনোযোগ সহকারে কথা শ্রবণ করাঃ
ইসলাম মানুষ স্বল্পবাক হওয়ার পরামর্শ দেয়। কেননা ‘বোবার কোনো শত্রæ নেই।’ অধিক কথা বলা বা বাচালতা করা ভাল নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা ও চুপ থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আর পারলে সকলের জন্য কল্যাণকর উত্তম কথা বলা উচিত। অন্যথা চুপ থাকা কর্তব্য। সেই সাথে মিথ্যা ও অশ্লীল কথা-বার্তা থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ،
‘যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (সহীহ বুখারীঃ ৬০১৮-১৯; সহীহ মুসলিমঃ ৪৭; মিশকাতঃ ৪২৪৩)
পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের সাথে আলোচনা করতে হয়। সে ক্ষেত্রে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ বলেন,
الَّذِيْنَ يَسْتَمِعُوْنَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُوْنَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِيْنَ هَدَاهُمُ اللهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ،
‘যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্যে যেটা উত্তম সেটার অনুসরণ করে। তাদেরকে আল্লাহ সুপথে পরিচালিত করেন ও তারাই হ’ল জ্ঞানী’ (সূরা ঝুমার ৩৯ঃ ১৮)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
الحَيَاءُ وَالعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الإِيمَانِ، وَالبَذَاءُ وَالبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النِّفَاقِ.
‘লজ্জা-সম্ভ্রম ও অল্প কথা বলা ঈমানের দুইটি শাখা। অশ্লীলতা ও বাকপটুতা (বাচালতা) নিফাকের দুইটি শাখা।’ (তিরমিযী ঃ ২০২৭)
তিনি বলেন
الْحَيَاءُ مِنَ الإِيْمَانِ
‘লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ।’ (সহীহ বুখারীঃ ২৪; সহীহ মুসলিমঃ ৩৬; মিশকাতঃ ৫০৭৭)
উপহাস না করা এবং মন্দ নামে না ডাকাঃ
কোন মানুষকে উপহাস করা কিংবা মন্দ নামে ডাকা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ করণে পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পায়। যার পরিণতি হয় ভয়াবহ। তাই এসব মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বিরত থাকতে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُوْنُوْا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوْا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوْا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوْقُ بَعْدَ الْإِيْمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ-
‘হে বিশ্বাসীগণ! কোন সম্প্রদায় যেন কোন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে তারা তাদের চাইতে উত্তম। আর নারীরা যেন নারীদের উপহাস না করে। হতে পারে তারা তাদের চাইতে উত্তম। তোমরা পরস্পরের দোষ বর্ণনা করো না এবং একে অপরকে মন্দ লকবে ডেকো না। বস্তুতঃ ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা হ’ল ফাসেক্বী কাজ। যারা এ থেকে তওবা করে না, তারা সীমালংঘনকারী।’ (সূরা হুজুরাতঃ ৪৯/১১)
৫. গীবত ও চোগলখুরী না করাঃ
পরনিন্দা, দোষচর্চা বা গীবত-তোহমত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম হাতিয়ার। এ কাজ সমাজে হানাহানির পরিবেশ বৃদ্ধি করে। তাই এই ঘৃণ্য কর্ম থেকে বিরত থাকতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা,
يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوْا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيْهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوْهُ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَحِيْمٌ،
‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অধিক ধারণা হতে বিরত থাক। নিশ্চয়ই কিছু কিছু ধারণা পাপ। আর তোমরা ছিদ্রান্বেষণ করো না এবং একে অপরের পিছনে গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পসন্দ করে? বস্তুতঃ তোমরা সেটি অপসন্দ করে থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বাধিক তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু’ (সূরা হুজুরাতঃ ৪৯/১২)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيْمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِيْنَ وَلاَ تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِىْ بَيْتِهِ.
‘হে ঐসব লোক যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছে, কিন্তুঅন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলমানদের গীবত করবে না ও দোষ-ত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষ-ত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষ-ত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্ত করে ছাড়বেন।’ (মিশকাতঃ ৪৮৮০)
চোগলখুরীর পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ،
‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহীহ মুসলিমঃ ১০৫)
অন্যত্র তিনি বলেন,
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহীহ বুখারীঃ ৬০৫৬; সহীহ মুসলিমঃ ১০৫; মিশকাতঃ ৪৮২৩।)
তিনি আরো বলেন,
تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ، الَّذِىْ يَأْتِىْ هَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ وَهَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ،
‘ক্বিয়ামতের দিন তুমি আল্লাহর কাছে ঐ লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু‘মুখো। সে এদের সম্মুখে এক রূপ নিয়ে আসতো, আর ওদের সম্মুখে অন্য রূপে আসত।’ (সহীহ বুখারীঃ ৬০৫৮, ৩৪৯৪; সহীহ মুসলিমঃ ২৫২৬)
উপসংহারঃ
মহান আল্লাহ উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদেরকে সহকর্মীর সাথে ভাল ব্যবহার করার গুরত্ব বুঝার এবং আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মাধ্যমে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে এবং দেশও জাতির যে কোন প্রয়োজনে নিজেদেরকে নিবেদিত রাখতে তাওফিক দিন। আমিন।


No comments:
Post a Comment